
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা "বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু"—রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় এভাবেই আর্তচিৎকার করছিলেন মা আমেনা বেগম। কিন্তু তার সেই আকুতি পূরণ হয়নি। পাঁচ মাস বয়সী কোলজুড়ে থাকা আদরের সন্তান তাকরিম এখন সাদা কাফনে মোড়ানো এক নিথর দেহ।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশু তাকরিম। হাম, নিউমোনিয়া এবং রক্তে সংক্রমণের মতো জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ এক মাস লড়াই করার পর হার মানল এই ছোট্ট প্রাণ।
তাকরিমের বাবা মহসীন, যিনি পেশায় একজন অটোরিকশা চালক। তিনি জানান, ভোলার স্থানীয় চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে তাকরিমের অসুস্থতাকে হাম নয় বরং 'অ্যালার্জি' হিসেবে চিকিৎসা করেছেন। মহসীন আক্ষেপ করে বলেন, "ডাক্তারের কাছে ১০০ বার জিজ্ঞেস করছি বাচ্চাটার কি হাম হইছে? শুধু বলছে অ্যালার্জি হইছে। একটা বারও যদি হামের কথা বলত, তাইলে ছেলেরে আরও আগেই ঢাকায় নিয়া আসতাম।"
তাকরিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে পিআইসিইউর প্রয়োজনে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটিকে একদম শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন এই দম্পতি। এক পর্যায়ে তাঁরা একাত্তর টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কেউ যদি চিকিৎসার খরচ দেয় তবে তাঁরা প্রয়োজনে সন্তানকেও দিয়ে দেবেন—শুধু তাঁরা চান সন্তান বেঁচে থাকুক।
এই প্রতিবেদন দেখে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শিশুটির চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেন। মন্ত্রীর প্রতিনিধি গিয়ে হাসপাতালের ৪ লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করেন এবং নগদ আরও ১ লাখ টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেন। কিন্তু ততক্ষণে তাকরিমের শারীরিক অবস্থা নাগালের বাইরে চলে যায়। লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার পর দুপুর আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ছেলের মরদেহ নিয়ে ভোলার পথে রওনা হন শোকাতুর মা-বাবা।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শিশুটি হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্ত ও মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ নানা জটিলতায় ভুগছিল। এছাড়াও তার হার্টে একটি ছিদ্র ছিল।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি দেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শিশুর শরীরে জ্বর ও র্যা শ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং কোনোভাবেই বিষয়টিকে সাধারণ অ্যালার্জি হিসেবে অবহেলা না করতে।